নিউইয়র্কে আসার ২ মাস পরই চট্টগ্রামের মেয়ে নীলিমার মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন
নিউইয়র্ক থেকে : ভালবেসে বিয়ের পর স্বামীর স্পন্সরে আমেরিকায় আসার ২ মাস ৬ দিন পর নিউইয়র্ক সিটির ফুলটন স্ট্রীটে স্বামীর ঘরে সাবরিনা হাসান নীলিমার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে এফবিআই এর হস্তক্ষেপ চেয়েছে তার বাবা-মা। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর ইকবাল পার্কের মেয়ে নীলিমার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে ফেডারেল প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে নীলিমার বাবা চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রেজাউল হাসান এবং মা রওশন আরা বেগম যুক্ত স্বাক্ষরের এক পত্রে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ১৯ জুলাই এ আবেদন জানিয়েছেন।
মৃত নীলিমার শশুর বাড়ির লোকেরা পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে, নীলিমা শয়নকক্ষে খাটের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে অত্মহত্যা করেছেন। এরপর ৬ জুলাই তার লাশ বাংলাদেশে নেয়া হয়। অপরদিকে নীলিমার বাবা এবং মা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে প্রদত্ত দরখাস্তে উল্লেখ করেছেন, ‘যৌতুক না দেয়ার কারণে তারা আমাদের মেয়েকে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করে জীবন দুর্বিসহ করে তোলেন।
….তাদের ঘরের ল্যান্ড ফোন হতে এই ঘটনা আমাদেরকে মেয়ে (নীলিমা) প্রথম জানায়। পরবর্তী পর্যায়ে তার টেলিফোন নিয়ন্ত্রণ করতো যাতে করে মেয়ে সব সমস্যা আমাদের খুলে বলতে না পারে।’ ঐ দরখাস্তে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ২৯ জুন বাংলাাদেশ সময় রাত ১১.৪০ মিনিটে আমাদের জামাতার সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেছি। মেয়ের সাথেও মোবাইল ফোনে কথা হয়। মেয়ে সে সময় জানায় যে, তার মামা শশুড় বাহার, বাহারের মেয়ে নাসরিন, ছেলে আক্তার, আরেক মামা শশুড়ের মেয়ে খেলনা, খেলনার ভাই শাহীন বাসায় এসেছে, সে ঝামেলার মধ্যে আছে, পরে কথা বলবে।’
ঐ দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ টেলিফোনের ঘন্টা ছয়েক পর অর্থাৎ ‘৩০ জুন বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় নীলিমার মামা শশুর বাহার টেলিফোনে জানায় যে, নাজিমউদ্দিন(জামাতা) এবং আমাদের মেয়ে নীলিমা দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমাদের মেয়ে নীলিমার বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। এর প্রায় ৩ ঘন্টা পর অর্থাৎ সকাল ৯টার দিকে নীলিমার শশুর মো. ইয়াসিন টেলিফোনে জানান যে, আমাদের মেয়ে নীলিমা তাদের ঘরে খাটের স্ট্যান্ডে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে এবং তাকে কিং কাউন্টি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
লাশের ময়না তদন্ত চলছে। এ সময় আমরা তাকে অনুরোধ করি ময়না তদন্ত শেষে লাশটি যেন বাংলাদেশে এনে আমাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। ৮ জুলাই নীলিমার শ্বাশুড়ি এবং শশুর লাশ নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে আসেন। তারা জানান লাশের পোস্টমর্টেম ও সকল আইনগত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে লাশটি আনা হয়েছে।
আমরা শোকে কাতর ও অস্থির ছিলাম এবং লাশটির দাফন কার্য সম্পন্ন করে ফেলি। এরপর নীলিমার শশুর ও শ্বাশুড়ি একটি ডেথ সার্টিফিকেট দেন এবং তারা তাদের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে চলে যান। আমাদেরকে টেলিফোনে জানান যে, পরবর্তীতে আমাদের সাথে বসে এ বিষয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা কোন যোগাযোগ অথবা আলোচনা করেননি।
দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়, ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী লাশের পোস্টমর্টেম করা হয়নি। দরখাস্তে বলা হয়েছে, ‘তাই আমাদের কাছে আশ্চর্যের বিষয় হলো আমাদের মেয়ের মৃত্যুর আসল কারণ গোপন করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ময়না তদন্ত না করার ব্যবস্থা করেছেন। এতে আমরা এবং আমাদের এলাকার লোকজনের মনে মেয়ের (নীলিমা) মৃত্যুর কারণ সংক্রান্ত বিষয়ে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। তদুপরি আমাদের মেয়ে আত্মহত্যা করে থাকলেও কেউ না কেউ এ আত্মহত্যা করতে তাকে বাধ্য করেছে অথবা প্ররোচিত করেছে। যা আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আমাদের আশংকা, আমাদের মেয়েকে তারা হত্যা করে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে প্রকৃত রহস্য গোপন করা হয়েছে।’ নীলিমার মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের জন্য যথাযথ তদন্তপূর্বক দোষী ব্যক্তিদের আইনে সোপর্দ করার জন্যে আমরা বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এদিকে নীলিমার মৃত্যু সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছে যে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন এবং তার লাশের অটোপ্সী (ময়না তদন্ত) করা হয়নি। লাশ নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় পরিবহনের পর ঢাকা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে কাস্টম হাউজে প্রদত্ত দরখাস্তে নীলিমার শশুর মো. ইয়াসিন ঘোষণা করেছেন যে, নীলিমা দুর্ঘটনা(এক্সিডেন্ট)য় মারা গেছেন। আত্মহত্যাকে দুর্ঘটনা হিসেবে কেন উল্লেখ করা হয়েছে সে জিজ্ঞাসা নীলিমার মা-বাবার। তারা নিউইয়র্কের মানবাধিকার সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং এফবিআইয়ের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তাদের আদরের কন্যার মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে সার্বিক সহযোগিতার জন্যে।
তারা এনাকে আরো বলেছেন, আগে জানতাম যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন অত্যন্ত স্বচ্ছ। কিন্তু কন্যার মৃত্যুর মাঝ দিয়ে জানলাম যে, আমাদের ধারণা সত্য নয়। নীলিমা আত্মহত্যা করেছেন জেনেও তারা পোস্টমর্টেম করেননি। নীলিমার বাবা এনাকে আরো বলেছেন যে, মৃত্যু সার্টিফিকেট প্রদানকারী ডা. মেলিসার সাথে টেলিফোনে তারা কথা বলে জেনেছেন যে, নীলিমার নিকটাত্মীয় হিসেবে মো. ইয়াসিন নাকি তাকে (ডা. মেলিসা) অনুরোধ করেছেন লাশ কাটাছেঁড়া না করতে এবং মুসলমানরা নাকি লাশের কাটাছেঁড়া পছন্দ করেন না।
মো. ইয়াসিনের কথায় বিশ্বাস করেই অটোপ্সী ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। সে সময় পুলিশ প্রশাসন অথবা অন্য কোন কর্তৃপক্ষকে যদি কেউ অভিযোগ করতেন তাহলে অটোপ্সি করা হতো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নীলিমা আত্মহত্যা করেছেন বলে নীলিমার শশুরসহ স্বজনেরা নিউইয়র্কের ঠিকানা এবং অন্য পত্রিকায় জানায়। একইসাথে তারা নীলিমার অটোপ্সী করার কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বরাবরে প্রদত্ত দরখাস্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে নীলিমার স্বামী নাজিমউদ্দিন বার্তা সংস্থা বাপ্স নিউজকে জানায় বলেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন এটিই সত্য। স্ত্রী আত্মহত্যার পর আমার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল বিধায় হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তিনি আরো বলেন, আমার শশুরের সাথে নিয়মিত কথা হচ্ছে টেলিফোনে। তিনি আরো বলেন, আমার স্ত্রী মারা যাবার পর গ্রামের বাড়িতে (সন্দ্বীপ) মিলাদ হয়েছে। তিনি বলেন, আমার বাবা-মা দেশে রয়েছেন, তারা বলতে পারবেন বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে।
এদিকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাবরিনা হাসান নীলিমার বিয়ে এবং আগে গায়ে হলুদ উপলক্ষে চট্টগ্রামে বিরাট অনুষ্ঠান হয়েছে। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা রেজাউল হাসান। অথচ সে বিয়ে টিকলো না বিধায় নীলিমার বড় দুবোনের বিয়ে নিয়ে শংকায় পড়েছেন তার বাবা। কারণ ঐ দুজনেরই বিয়ে ঠিক হয়েছে দুজনের সাথে যারা বিদেশে বাস করছেন। তিনি আর কোন কন্যাকে হারাতে চান না প্রবাসীর কাছে বিয়ে দিয়ে-এ আক্ষেপ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ রেজাউল হাসান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নীলিমা এতটাই পাগল হয়েছিলেন আমেরিকান সিটিজেনের সাথে বিয়ে বসতে যে, কলেজ পড়া শেষ হবার আগে এবং বড় দুই বোনের বিয়ের আগেই তার বিয়ের আয়োজন করতে বাধ্য হন তার বাবা।
নীলিমার মৃত্যু রহস্য সম্পর্কিত একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট শুক্রবার প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানায় ছাপা হবার পর কম্যুনিটিতে বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে অটোপ্সী ছাড়াই কেন লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের ধারণা, অটোপ্সী করা হলে নীলিমার মৃত্যু নিয়ে কারো প্রশ্নের উদ্রেক ঘটতো না।